দেশবন্ধুর স্বরাজ্য পার্টি শেরেবাংলার কৃষক প্রজা পার্টি নবাব সলিমুল্লাহর মুসলিম লীগ মওলানা ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি—কোনোটিই রাজনৈতিক উত্থান-পতন ও ঘাত-প্রতিঘাতে টিকতে পারেনি
আওয়ামী লীগ তার স্রষ্টা ভাসানী সোহরাওয়ার্দীকে পেরিয়ে শেখ মুজিবের হাতে পড়ে যেন এক চিরঞ্জীব রাজনৈতিক দলে পরিণত হলো
বঙ্গবন্ধু দেখিয়েছেন রাজনীতি কীভাবে সমকালীন প্রবণতাগুলোকে ধারণ করার মতো সৃজনশীল হতে পারে
ফলে তাঁর হাতে আওয়ামী লীগ দলের নাম থেকে মুসলিম পরিচিতি বাদ দিয়ে প্রথমে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক হয়ে আপামর বাঙালির জন্য পথ খুলে দেয়
আবার ষাটের দশকে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক প্রবণতা লক্ষ করে এককালের মার্কিনপন্থী আওয়ামী লীগ সমাজতন্ত্রের পতাকা তুলে ধরে
পঁচাত্তরের পরে পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে আমরা দেখছি আওয়ামী লীগ কট্টর জঙ্গি ইসলামি রাজনীতির বিরুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য মডারেট মুসলিম পরিচিতিকে তার রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ করে নিয়েছে
এর জন্য কট্টর প্রগতিশীলরা আওয়ামী লীগকে দোষী করতে পারে কিন্তু সম্ভবত উত্তরে আওয়ামী লীগ বলবে সমাজের এই পশ্চাৎপসরণ দেশের বুদ্ধিজীবী-শিল্পী-সাহিত্যিকেরা তো ঠেকাতে পারেনি
আসলে বাংলাদেশ-সমাজের দুর্বলতাটা ঘটে গেছে এইখানে এ দেশে অতীতে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মুক্তচিন্তার প্রগতিশীল ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি ছিলেন সমাজে সবচেয়ে সক্রিয় জোরালো অংশ
তাঁরাই সমাজে পরিবর্তনের ঢেউ তুলতেন পরিবর্তনের পক্ষে অগ্রসৈনিকের ভূমিকা পালন করতেন
ভাষা আন্দোলন ৫১-৫২-৫৪-৫৭-এর চট্টগ্রাম কুমিল্লা-ঢাকা-কাগমারির সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্মেলনগুলোর ভূমিকা ও পরবর্তীকালে এ দেশের রাজনীতিতে প্রভাবের কথা ভাবুন
ভাবুন ৬১-এর রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানমালার কথা
সেই সঙ্গে ষাটের দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলা একাডেমী এবং মূলধারার শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকার কথা ভাবুন
তাঁরাই সমাজকে এগিয়ে দিয়েছেন আর সে পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছে আওয়ামী লীগ
তাই ঊনসত্তরের পর আওয়ামী লীগ হয়ে উঠেছিল এ দেশের সচেতন জনসাধারণের মূল রাজনৈতিক দল
আজ চলছে অবক্ষয়ের কাল রাজনীতিতে ভাটার টান আর বদ্ধজলে কচুরিপানা মশার উপদ্রব বাড়ছে
আওয়ামী লীগ এর থেকে মুক্ত নয়
যদি সচেতন অংশ সমাজকে সচল করার সামনে এগিয়ে নেওয়ার প্রণোদনা তৈরি করতে না পারে তবে আরও দুর্দিন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে
ফলে দেশ টিকবে কি না সমাজ বাঁচবে কি না মানুষ এগোবে কি না—এসব বিএনপির ওপর তো নির্ভর করছেই না আওয়ামী লীগের ওপরও নয়
নির্ভর করছে বুদ্ধিজীবী-পেশাজীবীসহ সচেতন শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ওপর
এ কথা হয়তো বলা যায় এভাবে অবক্ষয় ও স্থবিরতার কাল দীর্ঘস্থায়ী হলে বিএনপির পক্ষে রাজনীতিতে টিকে থাকা ও দলের অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন হবে
অতীত তা-ই বলছে
কিন্তু সমস্যা জটিলতর হয়ে পড়ছে এ কারণে যে অবক্ষয় ও স্থবিরতার সংক্রমণ থেকে শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীরাও মুক্ত নন
অর্থাৎ এখানেও অবস্থা সঙ্গিন
ফলে মুসলিম লীগ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে জামাত দুর্বল হলে জঙ্গিবাদীরা বন্দী হলে কিংবা তাদের বটবৃক্ষ বিএনপি অস্তিত্বের সংকটে পড়লেও সমাজে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিকতার মানবিক আবহ তৈরি একেবারে নিশ্চিত নয়
তার জন্য পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের মতো নাগরিক মধ্যবিত্তের একটি সামাজিক জাগরণ দরকার
বাংলাদেশে আজ সেটিই আশু করণীয়
নয়তো বাকি কার্যক্রমে সমস্যার চাপান-উতোর চলতেই থাকবে এবং জনগণের ভোগান্তি চলবে ও তারা অতিষ্ঠ হতে থাকবে
আর ক্ষমতাসীনেরা জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে আগ্নেয়গিরির ওপর পিকনিক করবে
আবুল মোমেন কবি প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক
রাজকীয় সম্মেলন
বিচার বিভাগ যতটা পৃথক হয়েছে বিচারকদের মনমানসিকতা ততটা পৃথক হয়নি
বিচার বিভাগ পৃথক্করণের পর এই প্রথম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজ
আর সম্মেলনের রাজকীয় আয়োজনটাই বলে দেয় ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে বিচারকেরাও কম যান না
সে কারণে সরকারপ্রধানই প্রধান অতিথি
অনেক বিচারকের কাছে মাসদার হোসেন মামলা একটি বিলাসিতা
ধ্যানে জ্ঞানে তাঁরা পাবলিক সার্ভেন্ট
বুক ফুলিয়ে তাঁরা তা উচ্চারণে শরমিন্দা বোধ করেন না
অন্য দিকে নির্বাহী বিভাগের চরিত্রও বদলায়নি
সার্বিক বিচারে চরিত্র বদলায়নি আইন বিভাগেরও
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে তাদের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের টানাপোড়েনের কথা কচিৎ জানতে পারি
ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স সংশোধন করে জেলা জজদের প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া হনুজ দূর অস্ত
এই প্রথম বঙ্গভবনে জেলা জজদের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎ ঘটতে যাচ্ছে
সেখানে তাঁরা বিচার বিভাগীয় কার্যক্রম সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করবেন
এর নেতৃত্ব দেবেন ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ জাহাঙ্গির হোসেন বাদল
রাষ্ট্রপতির পরিবারের সঙ্গে ঢাকার বর্তমান জেলা জজের সখ্য থাকার একটা কথা চালু রয়েছে
বঙ্গভবনে আজকের সান্ধ্য বৈঠক সেটি নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে
উপরন্তু এটা হচ্ছে এমন একটি প্রেক্ষাপটে যখন বিচার মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি আইন সচিব ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারকে চিঠি দিয়েছে
৭ ডিসেম্বর তাঁরা এসে বলবেন কী নীতির ভিত্তিতে বিপুলসংখ্যক জ্যেষ্ঠ জেলা জজকে ডিঙিয়ে তাঁকে ঢাকা জেলা জজ নিয়োগ করতে হয়েছিল
আমরা এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই
কারণ বিচার বিভাগ নামের স্তম্ভটির জবাবদিহি যে সংসদের কাছে  সেটা এ দেশে একেবারেই অনুচ্চারিত
বিচারক সমিতিও সংসদীয় কমিটির সভাপতিকে আমন্ত্রণ জানানোর দরকার মনে করেনি
এর আগে লিখেছিলাম সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগ যেন একটি ব্যাপকভিত্তিক সম্মেলনের আয়োজন করে
সেখানে বিচার প্রশাসনের বিষয়ে উপযুক্ত স্কিম ও কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হবে
কিন্তু আমরা এ রকম কোনো অনুশীলন দেখিনি
সদ্য অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি প্রায় খামোখা দেশময় সফর করলেন
বর্তমান প্রধান বিচারপতি সম্প্রতি সারা দেশের বিচারকদের ঢাকায় এনে সম্মেলন করলেন
সেখানে উচ্চ আদালতের বিচারপতিরা গরহাজির ছিলেন
সম্মেলনের যে বিবরণ শুনেছি তা আমাদের হতাশ করেছে
এক হাজার ২০০ বিচারক কী করে বিচারাধীন ১৬ লাখ মামলা নিষ্পত্তি করবেন—এ ধরনের কোনো নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরির আলোচনা সেখানে হয়নি
বদলি ও কর্মস্থল নির্ধারণ নিয়ে অধস্তন আদালতে তুঘলকি কাণ্ড চলছে
এসব দেখে সবচেয়ে আশাহত তরুণ বিচারকেরা
সরকার খেয়াল-খুশিমতো প্রস্তাব দিচ্ছে
সুপ্রিম কোর্ট কোনো সামঞ্জস্য রক্ষা ছাড়াই তাতে সাড়া দিচ্ছেন
আমরা মনে করি বর্তমান জিএ জেনারেল এডমিনেস্ট্রশন কমিটি সংবিধানসম্মত নয়
এর বৈধতা যুক্তিযুক্ত কারণেই চ্যালেঞ্জযোগ্য
প্রায় তিন বছর আগে আমরা সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন রেজিস্ট্রারের আমলে বদলি-সংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছিলাম
কাজি হাবিবুল আউয়ালের মামলায় হাইকোর্ট প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে শুধু রেজিস্ট্রারের দায় নির্ধারণে ফুল কোর্টকে তদন্তের নির্দেশনা দিয়েছিলেন
এবারও আমরা দেখি সংসদীয় কমিটি রেজিস্ট্রারকেই ডাকলেন
কিন্তু আসলে কলকাঠি তো রেজিস্ট্রারের হাতে থাকে না
আগের ঘটনায় আমাদের আশঙ্কাই সত্যি হয়েছিল
সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক সত্তা বিস্ময়কর টালবাহানা করল
তারা সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পেল
স্পষ্টতই ওই সময়ে বদলিগুলোর তদন্ত হলে সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক স্ববিরোধিতা ও অস্বচ্ছতা উন্মোচিত হতো
ওই সাবেক রেজিস্ট্রার ইকতিদার আহমেদকে বিধি লঙ্ঘন করে খুলনায় বদলি করা হয়
এর প্রতিবাদে তিনি স্বেচ্ছা অবসরে যান
ইকতিদার আহমেদ প্রতিবাদী হওয়ামাত্রই মরচেপড়া তদন্ত প্রস্তাব নাটকীয়ভাবে ফুল কোর্টে আসে
আবার ফুল কোর্ট মহতী সিদ্ধান্ত নেন
যেহেতু তিনি অবসরে যাচ্ছেন তাই এই তদন্ত আমরা করব না
এটা হলো সুপ্রিম কোর্টের স্ববিরোধিতার দৃষ্টান্ত
সংসদীয় কমিটির উচিত হবে বিষয়টি আমলে নেওয়া
সাবেক রেজিস্ট্রারকে কমিটির সামনে কথা বলতে দিলে অনেক সত্য বেরিয়ে আসবে
শুধু চিঠি দিয়ে বদলির তদবির ঠেকানো যাবে না
প্রধান বিচারপতি ও জিএ কমিটি সম্ভবত তদবিরে বিরক্ত
তাঁরা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ভয় দেখিয়েছেন
কিন্তু এটা বিহিত নয়
বিহিত হলো বদলির লিখিত নীতিমালা তৈরি ও তা নিরপেক্ষভাবে বাস্তবায়ন করা
এবার একটি অভ্যুত্থানের গল্পও বলি
বিচারক সমিতির সভাপতি ছিলেন ঢাকার জেলা জজ আবদুল গফুর
মহাসচিব গাজীপুরের জেলা জজ শাহজাহান সাজু
আওয়ামী লীগ-সমর্থিত একটি গ্রুপ সমিতি করতলগত করতে মরিয়া হয়ে ওঠে
তারা প্রধানমন্ত্রীকে ভুল পরামর্শ দিয়ে সভাপতি ও মহাসচিবকে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই চাকরিচ্যুত করাতে সক্ষম হয়
প্রধানমন্ত্রী যদিও প্রশংসনীয়ভাবে তাঁর ভুল শুধরে নেন
তাঁরাও চাকরি ফিরে পান
কিন্তু ওই গ্রুপের উদ্দেশ্য সফল হয়
তারা সামরিক স্টাইলে বিচার সমিতির গঠনতন্ত্র তছনছ করে
আবদুল গফুরকে সরিয়ে আনা হয় কৃষ্ণা দেবনাথকে বর্তমানে হাইকোর্টের বিচারক
ঢাকার জেলা জজ হয়েই তিনি মহাসচিবকে না জানিয়ে সমিতির সভা ডাকেন এবং রক্তপাতহীন অভ্যুথান ঘটান
সমিতির সভাপতির পদটি পদাধিকার বলে হলেও মহাসচিব পদটি তা নয়
অথচ মহাসচিবকে কিছু না জানিয়ে তাঁকে উৎখাত করা হয়
